গান-বাজনা ‘শরিয়তবিরোধী’ : ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে দাঁড়াবে কে?
এই বাংলাদেশে গান-বাজনা বা কনসার্টকে প্রকাশ্য দিবালোকে ঘোষণা করা হয় ‘শরিয়তবিরোধী’ কর্মকা- হিসেবে! এটাই প্রথম নয়, গত দুই বছর ধরেই ক্রমাগত চলছে সংস্কৃতির বিরুদ্ধে এই প্রতিবাদ ও ঘৃণা। যার সর্বশেষ নজির মিলেছে ১৭ আগস্ট ২০২৬ কিশোরগঞ্জ থেকে। এদিন, কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার ইমাম-উলামা পরিষদের সভাপতি মাওলানা আহমাদুল্লাহ স্বাক্ষরিত একটি চিঠি জেলা প্রশাসকসহ প্রশাসনের বিভিন্ন কর্তা বরাবর প্রেরণ করেন। যেখানে তিনি স্পষ্ট ভাষায় লিখেন- ১৯ আগস্ট ২০২৬, রোজ বুধবার কিশোরগঞ্জ পুরাতন স্টেডিয়ামে শরিয়তবিরোধী গান-বাজনার অনুষ্ঠান হতে যাচ্ছে। প্রকাশ্য এ ধরনের অনুষ্ঠান আল্লাহ তায়ালার আযাব আসার কারণ। বিগত সরকারের আমলেও কিশোরগঞ্জের জমিনে তওহিদি জনতা ও উলামায়ে কেরামের ভূমিকায় এবং প্রশাসনের সহযোগিতায় এ রকম অনুষ্ঠান হতে পারেনি। এখন যদি এ রকম প্রোগ্রাম অনুষ্ঠিত হয় তাহলে পরিস্থিতি ঘোলাটে হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অতএব শরিয়তবিরোধী ওই অনুষ্ঠান বন্ধ করার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করা হলো। আগেও এমন অসংখ্য কনসার্ট, বাউল মেলা কিংবা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সরাসরি হামলা চালিয়েছে দেশের একটি মৌলবাদী চক্র। এবার সেটি যেন প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রশাসনিক রূপ পেল এই আবেদনের মাধ্যমে। আপাতদৃষ্টিতে হয়তো খুব সাধারণ একটি আবেদন মনে হবে অনেকের কাছে। কিন্তু এই কাগজের ভাষা এবং দাবির ভেতরে যে চিন্তা ও ঘৃণার প্রতিফলন রয়েছে, সেটি আমাদের সামনে একটি বড় প্রশ্ন ছুড়ে দেয়। সেটি হলোÑ বাংলাদেশে আসলে কে ঠিক করবে, কোন গান শোনা যাবে, কোন সংস্কৃতিচর্চা করা যাবে, কোন অনুষ্ঠান হবে আর কোনটি হবে শরিয়াবিরোধী? কিশোরগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কাছে দেওয়া ওই স্মারকলিপিতে ‘শরিয়তবিরোধী গান-বাজনা ও কনসার্ট’ বন্ধের দাবি জানানো হয়েছে। সেখানে ধর্মীয় ব্যাখ্যার আলোকে গান-বাজনাকে আপত্তিকর হিসেবে তুলে ধরে প্রশাসনের কাছে এমন অনুষ্ঠান বন্ধের আবেদন করা হয়েছে। আবেদনকারীদের ধর্মীয় বিশ্বাস বা ব্যক্তিগতভাবে গান না শোনার অধিকার নিয়ে প্রশ্ন নেই। প্রশ্ন হলোÑ একটি ব্যক্তিগত ধর্মীয় বিশ্বাস কখন রাষ্ট্রের আইন ও নাগরিকের সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণের দাবি হয়ে ওঠে? এই সীমারেখাটিই আমাদের বুঝতে হবে। বাংলাদেশ একটি ধর্মপ্রাণ মানুষের দেশ, এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু বাংলাদেশ কোনো ধর্মীয় গোষ্ঠীর ব্যক্তিগত ব্যাখ্যা অনুযায়ী পরিচালিত হওয়ার দেশ নয়। এই রাষ্ট্রের নাগরিকের নিজ নিজ ধর্ম পালনের অধিকার যেমন আছে, তেমনি ধর্ম না মানার, গান শোনার, সিনেমা দেখার, নাটক করার, নাচের অনুষ্ঠান আয়োজনের এবং নিজের সাংস্কৃতিক পছন্দ অনুযায়ী জীবনযাপনের অধিকারও আছে। রাষ্ট্রের কাজ মানুষের বিশ্বাস নির্ধারণ করা নয়; রাষ্ট্রের কাজ মানুষের অধিকার রক্ষা করা। আজ যদি বলা হয় গান-বাজনা ‘শরিয়তবিরোধী’, তাই তা বন্ধ করতে হবে। কাল অন্য কেউ বলতে পারে ধর্ম-কর্ম ঠিক নয়, বন্ধ করতে হবে। সেটাও বন্ধ হবে? তারপর নাটক, চিত্রকলা, ভাস্কর্য, সাহিত্য, উৎসবÑ এক এক করে সংস্কৃতির প্রতিটি দরজা বন্ধ করার দাবি উঠতে পারে। ইতিহাসে পৃথিবীর বিভিন্ন সমাজে এমন পথের ভয়ংকর পরিণতি আমরা দেখেছি। সংস্কৃতির ওপর নিয়ন্ত্রণ শেষ পর্যন্ত শুধু শিল্পকে হত্যা করে না; মানুষের চিন্তার স্বাধীনতাকেও সংকুচিত করে। আর এখানেই ধর্মীয় মূল্যবোধ আর ধর্মান্ধতার পার্থক্য। ধর্ম মানুষের নৈতিকতা, আত্মশুদ্ধি ও মানবিকতার কথা বলতে পারে। কিন্তু ধর্মান্ধতা তখনই বিপজ্জনক হয়ে ওঠে, যখন একজন নিজের বিশ্বাসকে সবার জন্য বাধ্যতামূলক করতে চান। যখন নিজের পছন্দকে আইন বানানোর চেষ্টা হয়। যখন ভিন্নমতকে অপরাধ হিসেবে দেখা হয়। যখন যুক্তির বদলে ভয়, নিষেধাজ্ঞা ও সামাজিক চাপকে হাতিয়ার করা হয়। আর মৌলবাদ আরও ভয়ংকর হয়ে ওঠে তখন, যখন সেই মানসিকতা রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর প্রভাব বিস্তার করতে চায়। আমাদের মনে রাখা দরকার, রাষ্ট্র কোনো ব্যক্তির ধর্মীয় অনুভূতির পাহারাদার নয়। রাষ্ট্রকে একই সঙ্গে মসজিদে নামাজ পড়া মানুষটির অধিকার এবং কনসার্টে গান গাওয়া শিল্পীর অধিকার- দুটিই সমানভাবে রক্ষা করতে হবে। একজন নাগরিক যে জীবনদর্শনে বিশ্বাস করেন না, সেই জীবনদর্শন তার ওপর চাপিয়ে দেওয়ার অধিকার তার নেই। বাংলাদেশের সংস্কৃতি হাজার বছরের বহুত্ববাদের সংস্কৃতি। বাংলাদেশের জন্মই হয়েছে সকল ধর্ম-বর্ণ মত ও পথের সম্মান রক্ষার আবেগ থেকে। বাউল গান থেকে ভাটিয়ালি, রবীন্দ্রসংগীত থেকে নজরুলগীতি, লোকসংগীত থেকে আধুনিক গানÑ এই ভূখ-ের মানুষের জীবন ও আবেগের সঙ্গে সংগীত ও শিল্প ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। গানকে নিষিদ্ধ করার দাবি তাই কেবল একটি অনুষ্ঠানের বিরুদ্ধে দাবি নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমাদের আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন। আর সবচেয়ে উদ্বেগের জায়গা হলোÑ এ ধরনের দাবি যদি প্রশাসনের কাছে নিয়মিতভাবে পৌঁছাতে থাকে এবং প্রশাসন যদি যুক্তি ও আইনের বদলে চাপের কাছে নতি স্বীকার করতে শুরু করে, তাহলে একসময় নাগরিক স্বাধীনতার জায়গা সংকুচিত হতে বাধ্য। কোনো অনুষ্ঠান আইন ভঙ্গ করলে সেটি অবশ্যই বন্ধ হবে। অশ্লীলতা, সহিংসতা, অপরাধ কিংবা জননিরাপত্তার প্রকৃত ঝুঁকি থাকলে রাষ্ট্র ব্যবস্থা নেবে। কিন্তু কোনো অনুষ্ঠান শুধু কারো ধর্মীয় ব্যাখ্যার সঙ্গে মিলছে না এই কারণে সেটি বন্ধ করা সেটি হয়ে দাঁড়াবে রাষ্ট্রের জন্য আত্মঘাতী। রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের ভিত্তি হতে হবে আইন, সংবিধান ও নাগরিক অধিকার; কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ধর্মীয় ব্যাখ্যা দিয়ে নয়। আজ গান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। আগামীকাল হয়তো বই নিয়ে উঠবে। তারপর পোশাক, সিনেমা, নাটক কিংবা উৎসব নিয়ে। তাই প্রতিটি ক্ষেত্রেই এখন একটি স্পষ্ট সীমারেখা টানা জরুরি। আমরা কারো ধর্মীয় বিশ্বাসের বিরুদ্ধে নই। কিন্তু ধর্মের নামে অন্যের স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়ার বিরুদ্ধে আমাদের অবশ্যই দাঁড়াতে হবে। কারণ ধর্মীয় স্বাধীনতা মানে শুধু ধর্ম পালন করার স্বাধীনতা নয়; এর অর্থ হলোÑ প্রত্যেক মানুষের নিজের বিবেক অনুযায়ী জীবন বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে মসজিদের আজান যেমন থাকবে, তেমনি মঞ্চে গানও থাকবে। ধর্মীয় আলোচনা যেমন থাকবে, তেমনি সাহিত্য-সংস্কৃতির অনুষ্ঠানও থাকবে। কেউ চাইলে কনসার্টে যাবেন, কেউ চাইলে যাবেন না। কেউ গান শুনবেন, কেউ শুনবেন না। রাষ্ট্র কারো পছন্দ চাপিয়ে দেবে না। এই ভারসাম্যটিই সভ্য সমাজের বড় পরিচয়। আজ যদি আমরা গান বন্ধের দাবিকে ‘ছোট বিষয়’ ভেবে পাশ কাটিয়ে যাই, কাল হয়তো আরও বড় কোনো স্বাধীনতা রক্ষার জন্য আমাদের পথে নামতে হবে। তাই এখনই বলা দরকার বাংলাদেশে ধর্ম থাকবে, ধর্মীয় স্বাধীনতা থাকবে, ধর্মপ্রাণ মানুষও থাকবেন; কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালিত হবে আইন ও সংবিধানের ভিত্তিতে, ধর্মান্ধদের নির্দেশে নয়। সংস্কৃতির বিরুদ্ধে নয়, সংস্কৃতির স্বাধীনতার পক্ষে দাঁড়ানো এখন সময়ের দাবি। কারণ গান বন্ধ করা খুব সহজ, কিন্তু একবার মানুষের কণ্ঠ বন্ধ হয়ে গেলে ডেকে আনবে ভয়ংকর বিপদ। এখন দেখার পালা, রাষ্ট্রপক্ষ মৌলবাদে মৌন সমর্থন দিয়ে সংস্কৃতির কণ্ঠ রোধ করবে, নাকি সর্বস্তরের নাগরিকদের কণ্ঠের স্বাধীনতা নিশ্চিত করবে।
রূপালী বাংলাদেশ